দ্বীনি শিক্ষা: নৈতিক সমাজ ও সফল জীবনের ভিত্তি।
শায়খ ক্বারী মোহাম্মদ শরীফ আহমদ
সিনিয়র শিক্ষক আল মাদিনা মডেল মাদ্রাসা, সিলেট।
শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু যে শিক্ষা মানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার পরিচয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সে শিক্ষা কখনো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা হতে পারে না। ইসলাম শিক্ষা বলতে এমন জ্ঞানকে বোঝায়, যা মানুষের হৃদয়ে আল্লাহভীতি সৃষ্টি করে, চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করে এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। তাই দ্বীনি শিক্ষা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জন্য নয়; বরং প্রতিটি মুসলমানের জীবনের অপরিহার্য অংশ।
ইসলামের সূচনাই হয়েছে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দিয়ে। মহান আল্লাহ তাআলা প্রথম ওহিতে ঘোষণা করেন—
﴿اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ﴾
“পড়ুন, আপনার সেই প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা আল-আলাক, ৯৬:১)
এ আয়াত শুধু পড়ার নির্দেশ নয়; বরং আল্লাহর নামে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং সত্যের সন্ধানে জ্ঞান অর্জনের আহ্বান। তাই ইসলামে শিক্ষা কখনো কেবল কর্মসংস্থান বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়; বরং আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি ইবাদত।
কুরআনে আল্লাহ তাআলা জ্ঞানীদের মর্যাদা সম্পর্কে বলেন—
﴿قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ﴾
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না—তারা কি কখনো সমান হতে পারে?”
(সূরা আয-যুমার, ৩৯:৯)
আবার তিনি ঘোষণা করেন—
﴿يَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ﴾
“আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দান করা হয়েছে, তাদের মর্যাদা বহুস্তরে উন্নীত করবেন।”
(সূরা আল-মুজাদিলাহ, ৫৮:১১)
এ আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, প্রকৃত সম্মান সম্পদ, ক্ষমতা কিংবা বংশে নয়; বরং ঈমান ও ইলমে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
«مَنْ يُرِدِ اللّٰهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ»
অর্থ: “আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।”
— সহীহ আল-বুখারী (৭১), সহীহ মুসলিম (১০৩৭)।
আর কুরআন শিক্ষার মর্যাদা সম্পর্কে তিনি বলেন—
«خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ»
অর্থ: “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।”
— সহীহ আল-বুখারী, হাদিস নং ৫০২৭।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, তথ্যের বিস্তার ঘটছে; কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে দুর্নীতি, প্রতারণা, মাদকাসক্তি, পারিবারিক ভাঙন, সহিংসতা ও নৈতিক অবক্ষয়। এর অন্যতম কারণ হলো জ্ঞানের সঙ্গে নৈতিকতার বিচ্ছেদ। সনদ বাড়ছে, কিন্তু সততা কমছে; দক্ষতা বাড়ছে, কিন্তু তাকওয়া কমছে।
দ্বীনি শিক্ষা মানুষকে শেখায়—আল্লাহ সবকিছু দেখছেন, প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে এবং অন্যের অধিকার নষ্ট করা মহাপাপ। এই বিশ্বাস একজন মানুষকে আইনের ভয়ে নয়, বিবেকের তাড়নায় সৎ থাকতে সাহায্য করে। এ কারণেই দ্বীনি শিক্ষা একটি শান্তিপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মূলভিত্তি।
এ কথা মনে রাখা জরুরি যে, ইসলাম কখনো দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখেনি। বরং ইসলামের স্বর্ণযুগে এমন বহু মনীষী জন্মগ্রহণ করেছেন, যারা কুরআন-হাদিসের পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও দর্শনে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—দ্বীনি মূল্যবোধে সমৃদ্ধ আধুনিক শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলা।
পরিবারই সন্তানের প্রথম শিক্ষালয়। অভিভাবকদের উচিত ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা, নামাজ, ইসলামী আদব-আখলাক এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শের সঙ্গে পরিচিত করা। যে ঘরে কুরআনের তিলাওয়াত হয়, যে পরিবারে ইসলামী শিক্ষার চর্চা থাকে, সেই পরিবারে শান্তি, বরকত ও নৈতিকতার পরিবেশ গড়ে ওঠে।
মাদ্রাসাগুলো কেবল ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়; এগুলো নৈতিক নেতৃত্ব তৈরির কেন্দ্র। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন, যুগোপযোগী পাঠদান এবং চরিত্র গঠনের পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
পরিশেষে, একটি কথা স্পষ্ট—যে জাতি দ্বীনি শিক্ষাকে অবহেলা করে, সে জাতি জাগতিকভাবে উন্নত হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর যে জাতি কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে শিক্ষা গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়ায় সম্মান এবং আখিরাতে সফলতা দান করেন।
আসুন, আমরা নিজেদের, আমাদের পরিবার এবং আগামী প্রজন্মকে দ্বীনি শিক্ষায় সমৃদ্ধ করি। কারণ, দ্বীনি শিক্ষা কেবল মসজিদ বা মাদ্রাসার বিষয় নয়; এটি একটি সুন্দর মানুষ, একটি আদর্শ পরিবার এবং একটি কল্যাণময় রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উপকারী ইলম, বিশুদ্ধ আমল এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনার তাওফীক দান করুন। আমীন।


