শায়খ ক্বারী মোহাম্মদ শরীফ আহমদ, সিনিয়র শিক্ষক আল মাদিনা মডেল মাদ্রাসা পরিচালক মারকাজুল কোরআন গ্লোবাল ইনস্টিটিউট
ইসলাম মানুষের জীবনকে সুন্দর, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও আল্লাহমুখী করার জন্য যে ইবাদতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে, তার মধ্যে নামাজ সর্বাগ্রে। নামাজ ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এবং মুমিনের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সর্বোত্তম মাধ্যম। কিন্তু শুধু নামাজ আদায় করলেই তা কবুল হবে—এমনটি নয়। নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য যেমন পবিত্রতা, কিবলামুখী হওয়া, সময়মতো আদায় করা, সতর আবৃত করা ইত্যাদি শর্ত রয়েছে, তেমনি কুরআন মাজীদের সহীহ ও শুদ্ধ তেলাওয়াতও নামাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা কুরআন স্পষ্ট, ধীরে ধীরে ও শুদ্ধভাবে তেলাওয়াত কর।”
(সূরা আল-মুযযাম্মিল, ৭৩:৪)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কুরআন এমনভাবে পড়তে হবে যাতে প্রতিটি অক্ষর তার যথাযথ মাখরাজ ও সিফাত অনুযায়ী উচ্চারিত হয়। তাজবীদসহ শুদ্ধ তেলাওয়াত কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্দেশ।
নামাজে সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করা প্রত্যেক রাকাতে ফরজ। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“যে ব্যক্তি সূরা আল-ফাতিহা পাঠ করেনি, তার নামাজ হয়নি।”
(Sahih al-Bukhari ও Sahih Muslim)
অতএব, যদি সূরা আল-ফাতিহা এমনভাবে ভুল পড়া হয় যে অর্থ পরিবর্তিত হয়ে যায়, তাহলে অনেক ফকীহের মতে নামাজ শুদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। তাই সহীহ কিরাআত শেখা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।”
(Sahih al-Bukhari)
এই হাদীস থেকে স্পষ্ট হয় যে, কুরআন শেখা এবং অন্যকে শেখানো ইসলামে সর্বোত্তম আমলগুলোর একটি। সহীহ তেলাওয়াত শেখা শুধু নামাজের জন্য নয়, বরং একজন মুসলিমের সারাজীবনের ইবাদতের ভিত্তি।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
“যাদেরকে আমি কিতাব দিয়েছি, তারা তা যথাযথভাবে তেলাওয়াত করে; তারাই এর প্রতি প্রকৃত ঈমান আনে।”
(সূরা আল-বাকারা, ২:১২১)
“যথাযথভাবে তেলাওয়াত” বলতে শুধু পড়া নয়; বরং শুদ্ধ উচ্চারণ, তাজবীদের নিয়ম মেনে তেলাওয়াত, অর্থ অনুধাবন এবং সেই অনুযায়ী আমল করাকে বোঝানো হয়েছে।
আজ আমাদের সমাজে অনেক মুসলমান নিয়মিত নামাজ পড়লেও কুরআন শুদ্ধভাবে পড়তে পারেন না। ছোটবেলায় কায়দা বা নূরানী শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকা, তাজবীদের প্রতি অবহেলা এবং নিয়মিত অনুশীলনের অভাবে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়। অথচ অল্প সময় নিয়মিত অনুশীলন করলে যে কোনো বয়সেই সহীহ কুরআন তেলাওয়াত শেখা সম্ভব।
প্রতিটি পরিবারে শিশুদের পাশাপাশি বড়দের জন্যও কুরআন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। মসজিদ, মাদরাসা এবং অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে তাজবীদসহ কুরআন শিক্ষা গ্রহণ করা আজ অনেক সহজ হয়েছে। তাই কোনো অজুহাত নয়; বরং সহীহ তেলাওয়াত শেখাকে জীবনের অপরিহার্য অংশ বানাতে হবে।
নামাজ মুমিনের মিরাজ। আর সেই নামাজের অন্যতম ভিত্তি হলো শুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সহীহ মাখরাজ ও তাজবীদের সঙ্গে কুরআন শেখা, নিয়মিত অনুশীলন করা এবং পরিবার-পরিজনকেও এ শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহীহভাবে কুরআন শিক্ষা ও তেলাওয়াত করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের নামাজ কবুল করুন।
আমীন।


