Homeসমগ্র বাংলাদেশআরাফার দিনের ফজিলত ও তাৎপর্য: শায়খ ক্বারী মোহাম্মদ শরীফ আহমদ সিনিয়র শিক্ষক...

আরাফার দিনের ফজিলত ও তাৎপর্য: শায়খ ক্বারী মোহাম্মদ শরীফ আহমদ সিনিয়র শিক্ষক : আল মাদিনা মডেল মাদ্রাসা,সুবিদ বাজার, সিলেট।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে এক অনন্য মর্যাদাপূর্ণ দিন হলো ” ইয়াওমু আরাফাহ” বা আরাফার দিন।

ইসলামের ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; বরং ঈমান, তাওবা, রহমত ও মুক্তির এক অপূর্ব আহ্বান। তেমনই এক মহিমান্বিত দিন হলো—আরাফার দিন। জিলহজ্জ মাসের ৯ তারিখে পালিত এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ফজিলতময়। হজের মূল স্তম্ভ যেমন এই দিনে সম্পন্ন হয়, তেমনি যারা হজে যেতে পারেননি, তাদের জন্যও এ দিন রহমত, মাগফিরাত ও নৈকট্য লাভের সুবর্ণ সুযোগ।

আরাফার দিন কী?
আরাফার দিন হলো সেই দিন, যেদিন হাজীগণ মক্কার অদূরে অবস্থিত ময়দানে আরাফা-এ অবস্থান করেন। রাসূল ﷺ বলেছেন:
“হজ হলো আরাফা।”
— (তিরমিজি)

অর্থাৎ, আরাফার ময়দানে অবস্থান করা হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুকন।
কুরআনের আলোকে আরাফার দিনের মর্যাদা
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”
— সূরা আল-মায়িদাহ: ৩
তাফসিরবিদগণ বলেন, এই মহিমান্বিত আয়াতটি আরাফার দিনেই নাজিল হয়েছিল। এটি ইসলামের পূর্ণতার ঘোষণা বহন করে।

আল্লাহ আরও বলেন—
“শপথ ভোরের, এবং দশ রাতের।”
— সূরা আল-ফজর: ১-২
মুফাসসিরগণ বলেন, এখানে “দশ রাত” দ্বারা জিলহজ্জের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে, যার শ্রেষ্ঠ দিনগুলোর অন্যতম হলো আরাফার দিন।

আরাফার দিনের বিশেষ ফজিলত:
১. গুনাহ মাফের মহাসুযোগ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“আরাফার দিনের রোজা পূর্বের এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হয়ে যায়।”
— (সহিহ মুসলিম)
এটি এমন এক মহান নেয়ামত, যেখানে মাত্র একটি দিনের রোজার বিনিময়ে দুই বছরের গুনাহ ক্ষমার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে (ছোট গুনাহসমূহ)।
২. জাহান্নাম থেকে মুক্তির দিন
হাদিসে এসেছে—
“আল্লাহ আরাফার দিনের চেয়ে বেশি আর কোনো দিনে এত মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না।”
— (সহিহ মুসলিম)

এই দিনে আল্লাহ বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমত নাযিল করেন এবং ফেরেশতাদের সামনে তাঁর বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন।
৩. দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়
রাসূল ﷺ বলেছেন—
“সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া।”
— (তিরমিজি)
এই দিনে বেশি বেশি তাওবা, ইস্তিগফার, জিকির, দরুদ ও দোয়ায় মশগুল থাকা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
বিশেষভাবে এই দোয়াটি পড়া উত্তম—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বাদীর।”
আরাফার দিনে করণীয় আমল
👉রোজা রাখা
যারা হজে নেই, তাদের জন্য আরাফার দিনের রোজা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত।
👉বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার
নিজের গুনাহের জন্য আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
👉 দোয়া ও জিকির
আল্লাহর প্রশংসা, তাকবির, তাহলিল, তাসবিহ ও দরুদ শরিফ পড়া।
👉 তাকবিরে তাশরিক পাঠ
জিলহজ্জের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত ফরজ নামাজের পর তাকবির পড়া ওয়াজিব (অনেক ফকিহের মতে)।
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।”
আরাফার দিনের শিক্ষা
আরাফার দিন আমাদের শিখায়—
দুনিয়ার অহংকার ভুলে আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করতে,
গুনাহ থেকে ফিরে আসতে,
মানবতার ঐক্য উপলব্ধি করতে,
এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে।
সাদা ইহরামে লাখো মানুষের একত্র হওয়া যেন কিয়ামতের ময়দানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সেখানে নেই ধনী-গরিবের বিভেদ, নেই বর্ণ বা জাতিগত অহংকার—আছে শুধু বান্দা ও তার রবের সম্পর্ক।
পরিশেষে উক্ত আলোচনা থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে,
আরাফার দিন শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা, রহমত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের এক মহামূল্যবান সুযোগ। এই দিনে একটি আন্তরিক তওবা বদলে দিতে পারে পুরো জীবন।
তাই আসুন, আমরা সবাই এই মহিমান্বিত দিনের মর্যাদা উপলব্ধি করি, বেশি বেশি ইবাদত করি এবং আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা লাভের জন্য হাত উঠাই।
“হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে আরাফার দিনের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত দান করুন। আমিন।”।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সবচেয়ে জনপ্রিয়

সাম্প্রতিক মন্তব্য